প্রকাশিত:
২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬:৪৬
ভেনেজুয়েলায় সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দেশগুলোর প্রতি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো। তিনি বলেছেন, এই অঞ্চলকে আর কোনোভাবেই বৈশ্বিক শক্তির সামরিক দ্বন্দ্বের মাঠে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। শান্তি, স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতাই হওয়া উচিত লাতিন আমেরিকার ভবিষ্যৎ পথচলার মূল ভিত্তি।
বুধবার (২৯ জানুয়ারি) পানামায় অনুষ্ঠিত ল্যাটিন আমেরিকা অ্যান্ড ক্যারিবিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ফোরাম–এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন পেত্রো। ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অফ ল্যাটিন আমেরিকা অ্যান্ড দ্য ক্যারিবিয়ান (CAF) আয়োজিত এই ফোরামে তিনি আঞ্চলিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন।
পেত্রো বলেন, আমরা চাই না কারাকাস কিংবা আমেরিকার কোনো শহর উত্তর কিংবা দক্ষিণ দিক থেকে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হোক। লাতিন আমেরিকার জনগণ বহু সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলেছে। আমরা একটি বৈচিত্র্যময়, ভিন্নধর্মী, কিন্তু গভীরভাবে আন্তঃসংযুক্ত সভ্যতা।
তার বক্তব্যে ভেনেজুয়েলার প্রসঙ্গ বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক এবং সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সামরিক শক্তি প্রয়োগ এই অঞ্চলের কোনো সমস্যার সমাধান নয়; বরং তা নতুন সংকট ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে পেত্রো বলেন, মাদক পাচার, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ বিপর্যয় এবং চলমান সশস্ত্র সংঘাত—এসব বৈশ্বিক হুমকি একক কোনো দেশের পক্ষে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এসব সমস্যার একমাত্র কার্যকর সমাধান হলো আঞ্চলিক সহযোগিতা, রাজনৈতিক সংলাপ এবং সম্মিলিত উদ্যোগ।
তিনি বলেন, “আমরা যদি বিচ্ছিন্ন থাকি, তাহলে দুর্বল থাকব। কিন্তু যদি ঐক্যবদ্ধ হই, তাহলে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারব। আমাদের অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে পারস্পরিক আস্থা ও সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ওপর।”
লাতিন আমেরিকার শক্তি সামরিক অস্ত্র কিংবা অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে আসে না—এই বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরেন পেত্রো। তার মতে, এই অঞ্চলের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে এর প্রাকৃতিক সম্পদ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং মানবিক মূল্যবোধে। যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিবর্তে বিশ্ববাসীকে একটি শান্তিপূর্ণ বিকল্প দেখানোর সক্ষমতা লাতিন আমেরিকার রয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আমরা কি খণ্ডিত ও বিচ্ছিন্ন থাকতে রাজি থাকব, নাকি একটি প্রকৃত আঞ্চলিক ঐক্য গড়ে তুলব?” এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে তিনি লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
ফোরামে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পেত্রো জলবায়ু সংকটের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অ্যামাজন বন ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরো অঞ্চলকে হুমকির মুখে ফেলছে। এসব সংকট মোকাবেলায় সামরিক বাজেট বাড়ানোর পরিবর্তে পরিবেশ সংরক্ষণ, টেকসই উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
ল্যাটিন আমেরিকা অ্যান্ড ক্যারিবিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ফোরামে এদিন ব্রাজিল, পানামা, বলিভিয়া, জ্যামাইকা, ইকুয়েডর ও গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্টসহ একাধিক দেশের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা, অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা অংশ নেন। ফোরামে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, জলবায়ু অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, পেত্রোর এই বক্তব্য কেবল ভেনেজুয়েলা ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা—লাতিন আমেরিকা আর বাইরের শক্তির রাজনৈতিক ও সামরিক পরীক্ষাগার হতে চায় না। অঞ্চলটির দেশগুলো এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করতে চায়।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের এই আহ্বান লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে নতুন করে ঐক্য ও সংলাপের আলোচনা উসকে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে এটি ভেনেজুয়েলা সংকটের ক্ষেত্রে সামরিক সমাধানের বিপরীতে কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক উদ্যোগকে আরও জোরদার করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন: