প্রকাশিত:
২০ জানুয়ারী ২০২৬, ১৭:২০
বগুড়ায় অপহরণের নাটক সাজিয়েছেন ৭৫ বছর বয়সের বৃদ্ধা মোছা. মাজেদা খাতুন ঘুন্নি। জেলার ধুনট উপজেলার আনারপুর দহপাড়া গ্রামে জমি সংক্রান্ত বিরোধে জেরে অপহরণের ঘটনা সাজিয়ে একের পর এক মামলা বানিজ্যে নেমেছেন এই বৃদ্ধা ও তার পরিবার। তার এই অপহরণ ঘটনা সাজানো নাটক বলে দাবি করছেন গ্রামবাসী।
এলাকাবাসী বলছেন, বৃদ্ধা ঘুন্নি খাতুনকে তার পরিবারের লোকজন গুম ও অপহরণের নাটক সাজিয়ে প্রতিবেশীদের ওপর মিথ্যা মামলা দিয়েছেন। এ সব মামলা মোকাবেলা করতে অনেকে হাজতবাস করেছেন। আবার কেউ ঘর ছাড়া হয়েছেন। অনেকেই আবার মামলা থেকে বাঁচতে ভিটা মাটি বিক্রি করে নিঃস্ব হয়েছেন। এমনকি ওই পরিবারের জামাইকেও মিথ্যা মামলা দিয়ে চার বছর জেল খাটিয়েছেন। এসব মিথ্যা নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে পুলিশের চাকুরি করা ঘুন্নির নাতী মোঃ মোস্তফা কামালের মদদে।
এদিকে, এই মামলাটি নিয়ে বগুড়ার সিআইডি পুলিশ তদন্তে নেমেছে। সিআইপি পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, মোছা. মাজেদা খাতুন ঘুন্নি নামের ৭৫ বছরের বৃদ্ধা অপহরণের ঘটনায় মামলা হয়েছে। সেই মামলাটি বগুড়ার সিআইডিকে তদন্তের দায়িত্ব দিলে সিআইডি পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বর সঙ্গে তদন্ত করছে। ঘুন্নি খাতুন অপহরণ হয়েছেন না আত্মগোপন করেছেন সে বিষয়টি নিয়েও কাজ করা হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০২২ সালের ৫ জুন রাত ২টার দিকে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে বৃদ্ধা মোছা ঘুন্নি খাতুনকে অপহরণ করা হয়। এরপর থেকে দীর্ঘ চার বছর পেরিয়ে গেলেও পুলিশ তাকে খুঁজে পাচ্ছেন না। ওই রাতে ধুনট উপজেলার আনারপুর দহপাড়ায় পূর্ব শত্রুতার জের ধরে অপহরণকারীরা ঘরের দরজা কেটে ঘুন্নি খাতুনের বাড়িতে প্রবেশ করেন। এরপর বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় তাকে অপহরণ করা হয়। এরপর থেকে তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।
পরে অপহৃত ঘুন্নি খাতুনের মেয়ে মোনেজা খাতুন বাদী হয়ে ধুনট থানায় মামলা করেন। সেই মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আসামী করা হয় আরো অনেককে। পরবর্তীতে পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলাটি সিআইডিতে নেওয়া হয়। বর্তমানে এটি সিআইডি পুলিশের সদস্যরা তদন্ত করছেন।
সরেজমিনে ধুনট উপজেলার আনাপুর দহপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মামলায় অপহরণের কথা উল্লেখ করা হলেও ঘটনাটি। উল্টো প্রতিবেশিরা বলছেন, অপহরণের ঘটানাটি পুরোটাই একটি সাজানো নাটক। তারা নিজেরাই বৃদ্ধা ঘুন্নিকে সবার আড়ালে গুম করেছে। প্রতিবেশিদের সাথে জমিজমা সংক্রান্ত জেরেই তারা এমন ঘটনা ঘটিয়েছেন। এদিকে অপহৃত ঘুন্নি খাতুনের মেয়ে মোনেজা খাতুনসহ তাদের পরিবারের কেউই থাকে না ওই গ্রামে। এখানে তাদের শুধু বাড়িটি ছাড়া আর কিছুই সেখানে নেই। এই ঘটনার পর থেকে তারা বাড়ির মালামাল নিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। বর্তমানে কোথায় আছেন প্রতিবেশিরা তা জানেন না। তবে অনেকেই বলছেন ঘুন্নি খাতুনের নাতি পুলিশের চাকরি করেন। হয়তো সেখানেই তারা থাকতে পারেন।
গ্রামবাসী বলছেন, মামলা বাদী মোনেজা খাতুন ও তার ছেলে পুলিশে কর্মরত মো. মোস্তফা কামাল চাকরির দাপটে ওই এলাকার নারী-পুরুষসহ প্রায় দুই শতাধিক ব্যক্তির উপর বিভিন্ন মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেছেন। বিশেষ করে ঘুন্নি খাতুনের গুম হওয়ার মামলায় অনেকে জেল খেটেছেন। আবার কেউ ঘর ছাড়া হয়েছেন। অনেকেই আবার মামলা থেকে বাঁচতে ভিটা মাটি বিক্রি করে নিঃস্ব হয়েছেন। তারা অনেকেই আজ সহায় সম্বলহীন হয়ে পড়েছেন। তারা আরও বলেন, এলাকার কাউকে মামলা দেওয়া থেকে বাদ রাখেনি ঘুন্নির পরিবার। মূলত পরিবারটি মামলাবাজ পরিবার। আমরা ঘুন্নি
বেগমের পরিবারের অত্যাচারে অতিষ্ট। তারা এখানে না থাকলেও কোথায় থেকে মামলা দেয় আমরা জানি না। ঘুন্নি খাতুনের নাতী পুলিশ সদস্য মোস্তাফা কামাল চাকরির আড়াকে মাদকের কারবার করেন। সে মাদক দিয়ে মিথ্যা নাটক সাজিয়ে এই গ্রামের অনেক নারী-পুরুষকে মামলার মধ্যে জড়িয়েছেন।
সদ্য জেল থেকে জামিনে মুক্ত হওয়া গুম হওয়া মামলার আসামী মোঃ বেলাল হোসেন জানান, ঘুন্নি খাতুন অপহরণ এর ঘটনা সম্পন্ন মিথ্যা এবং বানোয়াট। এটি তাদের সাজানো নাটক। প্রতিবেশিদের ফাঁসাতে এবং জমি সংক্রান্ত বিরোধে পূর্ব শত্রæতার জেরে তারা নিজেরাই লুকিয়ে রেখে গুমের মামলা করেছেন। তিনি বলেন, আমাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে ফাঁসানো হয়েছে। মামলা থেকে বাঁচতে আমি জমি-জমা বিক্রি করেছি। শুধু ভিটা মাটি ছাড়া আর কিছুই নেই। আমার মত গ্রামের প্রায় দুই শতাধিক নারী-পুরুষ তাদের জমি-জমা বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। আমরা ওই পরিবারের অত্যাচারে অতিষ্ট। মাজেদা খাতুন ঘুন্নির জামাই মো. দুলু মিয়া প্রামানিক জানান, আমাকে ট্যাপে ফেলে ঘুন্নির মেয়ে মোনেজা খাতুতের সাথে জোর করে বিবাহ দেয়। এরপর সংসার করা অবস্থায় অন্যায়ভাবে আমাকে নারী নির্যাতনের মামলা দেয় ওই পরিবার। সেই মামলায় আমাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয় আদালত। পরে উচ্চ আদালতে আপিল করে ৪ বছর কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পাই। আমার মতো গ্রামের অন্য মানুষের উপর মিথ্যা মামলা দিয়ে নিঃস্ব করে দিয়েছে।
বগুড়া সিআইডি পুলিশ সুপার মোতাহার হোসেন জানান, মোছা. মাজেদা খাতুন ঘুন্নি নামের ৭৫ বছরের বৃদ্ধা অপহরণের ঘটনায় মামলা হয়েছে। সেই মামলা বগুড়ার সিআইডিকে তদন্তের দায়িত্ব দিলে সিআইডি পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বর সাথে তদন্ত করছে। ঘুন্নি খাতুন অপহরণ হয়েছেন না আত্মগোপন করেছেন সে বিষয়টি নিয়েও কাজ করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে সকল বিষয় গোপন রেখে মূল ঘটনা উদঘাটনের জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন: