প্রকাশিত:
২৪ জুলাই ২০২৫, ১৬:৩৪
উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় একে একে নিভে যাচ্ছে অসংখ্য ছোট্ট প্রাণ। তাদেরই একজন ছিল সাদ সালাউদ্দিন—বাংলা মাধ্যমে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া এক উজ্জ্বল মুখ। যে আজ শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো দেশের এক অপূরণীয় ক্ষতির প্রতীক।
সাদের ঘরে এখনও ছড়িয়ে আছে তার উপস্থিতির স্মৃতি। বিছানার উপর ছড়ানো জামা-কাপড়, গোছানো বই-খাতার টেবিল, টেবিলের তাকে রাখা লাল ঘড়ির পাশে নীল রঙের আরেকটি ঘড়ি—সবকিছু যেন তার চঞ্চল অস্তিত্বের নিঃশব্দ সাক্ষী। যে দাদির কোলে আশ্রয় নিত প্রতিবার দুষ্টুমির বকা খেয়ে, সেই সাদ আজ চলে গেছে এমন এক জগতে, যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না।
বসার ঘরে শোকের ছায়া। নিঃশব্দে সোফার কোণে বসে আছেন বাবা সালাউদ্দিন মুকুল, অন্য ঘরে মা খুকুমনি আক্তার স্বজনদের মাঝে মাঝে চেপে রাখা কান্না আর্তনাদে রূপ দিচ্ছেন। চারপাশে শুধু একটা প্রশ্ন—“কেন?”
ঘটনাটি ঘটে গেল সোমবার দুপুরে, যখন একটি প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি আছড়ে পড়ে মাইলস্টোন স্কুলের উপর। সেদিনই সাদ স্কুলে গিয়েছিল কান্নাকাটি করে, কারণ আগের দিন রোববার সে ঠান্ডাজনিত অসুস্থতায় ক্লাসে যায়নি। অথচ সেদিনই সহপাঠীদের সঙ্গে মর্মান্তিকভাবে বিদায় নিতে হলো ছোট্ট সাদকে।
চার ঘণ্টা পর, রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ)-এর মর্গে সাদের মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। বাবা সাদকে শনাক্ত করেন তার হাতে থাকা লাল রঙের ঘড়ি দেখে। সেই ঘড়িটিই যেন একমাত্র অবশিষ্ট স্মারক হয়ে দাঁড়ায় সন্তানের।
সালাউদ্দিন-খুকুমনি দম্পতির বড় সন্তান ছিল সাদ। তার ছোট বোন সারার বয়স মাত্র দুই বছর। বড় চাচা আলাউদ্দিন টুটুল ওমান থেকে ছুটে এসেছেন সন্তানের মৃত্যুসংবাদ শুনে। ছোট চাচা মোহাম্মদ মাসুদ অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরছেন শোকের ভার বহন করতে।
সাদের বড় চাচা বলেন, “আমার ছেলের গল্প লেখা দরকার নেই। যদি রিপোর্ট করেন, তাহলে কারা দায়ী তাদের কথা লিখেন। তাদের বিচারের আওতায় আনুন। তবেই বুঝবো আপনারা কিছু করছেন।”
বাবা সালাউদ্দিন মুকুল বলেন, “আমার ছেলে আর তার বন্ধুরা নেই। অনেক শিশু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমাদের সন্তানদের শহীদের মর্যাদা দিতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের সম্মান জানাতে হবে।”
সাদের মরদেহ আনা হয় সিএমএইচ থেকে। জানাজা শেষে তাকে সমাহিত করা হয় মিরপুর সাড়ে নম্বর কবরস্থানে। চিরনিদ্রায় শায়িত হয় দাদার পাশেই। আর কোনোদিন ভোরে স্কুলের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বের হবে না সাদ। কোনোদিন হাসিমুখে দাদির কাছে ছুটে যাবে না। কেবল থেকে যাবে এক রঙহীন ঘর, কিছু ছিন্ন স্মৃতি—আর একটা টিকটিক করা লাল ঘড়ি।
মন্তব্য করুন: